সব ব্লগ
visa
18 Jun 2026
সৌদি ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা প্রসেসিং নতুন নিয়মাবলি। সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬
সৌদি ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা আবেদন ও প্রসেসিং নতুন নিয়মাবলি (১৪৪৮ হিজরি) — সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬
সৌদি আরবে থাকা প্রবাসীরা চাইলে তাদের পরিবারের সদস্যদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাছে নিয়ে আসতে পারেন ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা দিয়ে। ২০২৬ সালে সৌদি ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় কিছু নতুন নিয়ম যুক্ত হয়েছে — বিশেষ করে কাবিননামা অনলাইন ও e-Apostille বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে। এই গাইডে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং মেয়াদ সংক্রান্ত সব তথ্য বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।
ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা আসলে কাদের জন্য?
অনেকেই ভিজিট ভিসা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যান, কারণ সৌদি আরবে দুই ধরনের ভিজিট ভিসা চালু আছে এবং দুটোর নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা।
ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা:এটা শুধুমাত্র প্রবাসীর সরাসরি নিকটাত্মীয়ের জন্য ইস্যু হয় — বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান এবং শ্বশুর-শাশুড়ি। এর বাইরে দূরের কোনো আত্মীয় বা পরিচিতজনের জন্য এই ভিসা প্রযোজ্য নয়। পার্সোনাল বা ব্যক্তিগত ভিজিট ভিসা:বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কোনো পরিচিত মানুষকে আনতে চাইলে এই ভিসাটাই লাগবে, ফ্যামিলি ভিসা দিয়ে তাদের আনা যাবে না। আবেদন শুরু করার আগে এই পার্থক্যটা বুঝে নেওয়া জরুরি, কারণ ভুল ভিসা টাইপে আবেদন করলে পুরো প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যেতে পারে।
১. ভিসা আবেদনের জন্য প্রবাসীর কী কী যোগ্যতা থাকা লাগবে
আকামার মেয়াদ অন্তত ৩ মাস বাকি থাকতে হবে — আকামা প্রায় শেষ বা এক্সপায়ার হলে আবেদন গ্রহণ হবে না। পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ৬ মাস থাকা আবশ্যক। MOFA (Ministry of Foreign Affairs) এর মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। আবেদন নাম্বারের ভিত্তিতে কফিল বা কোম্পানির মাধ্যমে ভিসা চেম্বার বা অ্যাটেস্টেশন করাতে হবে। চেম্বার সম্পন্ন হলে সাধারণত ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ভিসা পাওয়া যায়, এবং ভিসা পাওয়ার পর ১ মাসের মধ্যে পুরো প্রসেসিং শেষ করতে হয়। একটা বিষয় অনেকেই জানেন না — প্রবাসীর পেশা যদি "আমেল আদি" (সাধারণ শ্রমিক) হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি আবেদনের সুযোগ সীমিত থাকে। তবে বর্তমানে "কিওয়া" এবং "আবশার" পোর্টালের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে, ফলে এখন আগের তুলনায় বেশি পেশার মানুষ আবেদন করতে পারছেন।
২. প্রয়োজনীয় নথিপত্র (ডকুমেন্টস)
ক. সৌদি প্রবাসীর জন্য (সৌদিতে অবস্থানরত)
পাসপোর্টের রঙিন ফটোকপি আকামার রঙিন ফটোকপি ভোটার আইডি কার্ড অথবা জন্ম নিবন্ধনের রঙিন ফটোকপি
খ. বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণকারী যাত্রীর জন্য
পাসপোর্টের রঙিন ফটোকপি ভোটার আইডি কার্ডের রঙিন ফটোকপি জন্ম নিবন্ধনের রঙিন ফটোকপি (অবশ্যই অনলাইন থাকতে হবে) অরিজিনাল কাবিননামা (অবশ্যই অনলাইনে ভেরিফাইড হতে হবে) পাসপোর্ট সাইজের ছবি — ৪ কপি (ল্যাব প্রিন্ট, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড)
গ. পরিবারের অন্য সদস্য সাথে থাকলে (বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোন)
রিলেশনশিপ অ্যাফিডেভিট (৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে) জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে এটেস্টেশন (সত্যায়ন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MOFA) কর্তৃক সত্যায়ন নোট: স্বামী-স্ত্রী হলে উপরের ৩টি ডকুমেন্টের প্রয়োজন নেই।
৩. কাবিননামা অনলাইন করার নিয়ম
বর্তমানে ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য কাবিননামা অনলাইন থাকা বাধ্যতামূলক, নতুবা ফাইল বাতিল হয়ে যাবে। কাবিননামা জেনুইন বা আসল হতে হবে জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে কাবিননামা অনলাইনের জন্য আবেদন করতে হবে আবেদন যাচাইয়ের সময় বিয়ে সম্পাদনকারী কাজীর কাছে ভেরিফিকেশন কল যাবে। কাজীর কল রিসিভ ও ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হলে ২-৩ দিনের মধ্যে কাবিননামা অনলাইনে সাবমিট হয়ে যাবে। পরামর্শ:কাজীকে আগে থেকে অবগত করে রাখুন, যেন তিনি ফোন রিসিভ করেন — অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কাজী ফোন রিসিভ না করায় পুরো প্রসেস কয়েক সপ্তাহ আটকে থাকে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ আপডেট: ই-অ্যাপোস্টিল (e-Apostille)
ভিসা সংক্রান্ত সকল ডকুমেন্ট অবশ্যই ই-অ্যাপোস্টিল করতে হবে ই-অ্যাপোস্টিল ছাড়া তাশির সেন্টার (Tasheer Center) ফাইল গ্রহণ করবে না ভিসা বাতিলের ঝুঁকি এড়াতে অবশ্যই ১০০% অরিজিনাল বা জেনুইন ই-অ্যাপোস্টিল জমা দিতে হবে। ডুপ্লিকেট বা ক্লোন কপি গ্রহণযোগ্য নয়
৫. তাশির সেন্টারে ভিসা প্রসেসিং (ধাপসমূহ)
সকল অরিজিনাল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করুন নির্ধারিত তাশির সেন্টারে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ডকুমেন্ট জমা দিন ভিসা ফি (বয়সভেদে ১৬,৫০০ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা) নিজ দায়িত্বে জমা দিন সেন্টারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পন্ন করুন ভিসা ইস্যু হলে নিজ দায়িত্বে এয়ার টিকিট সংগ্রহ করুন সাধারণত পুরো প্রসেসিং সময় ১৫ কার্যদিবস (পরিবর্তনশীল)। ভিসা পাওয়া সম্পূর্ণ সৌদি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, এবং বর্তমানে কফিল চেম্বার ছাড়া আউট চেম্বারের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কিছুটা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
৬. ভিজিট ভিসার মেয়াদ ও মেয়াদ বাড়ানোর নিয়ম
অনেকেই ভিসা হাতে পাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন মেয়াদ নিয়ে। সিঙ্গেল আর মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার নিয়ম আলাদা, এটা গুলিয়ে ফেললে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা:সাধারণত ৩০ দিনের জন্য ইস্যু হয়, কিন্তু প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন (৬ মাস) পর্যন্ত বাড়ানো যায়। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৭ দিন আগে আবশার পোর্টালে গিয়ে রিনিউ করা সম্ভব। মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা: এর মেয়াদ ১ বছর থাকলেও প্রতি ৯০ দিন পর পর দেশ ত্যাগ করতে হয় বা বর্ডার ক্রস করতে হয়। অনলাইনে আবশার পোর্টালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফি ও ইন্স্যুরেন্স দিয়ে ঘরে বসেই এই মেয়াদ বাড়ানো যায়। যাদের কোনো কারণে অনলাইনে রিনিউ করা সম্ভব হয় না, তারা বাহরাইন বা জর্ডান বর্ডার দিয়ে এক্সিট-রিএন্ট্রি করেও মেয়াদ চালিয়ে নিতে পারেন — এটা অনেক প্রবাসী ব্যবহার করেন যখন আবশারে কোনো জটিলতা থাকে।
৭. হেলথ ইন্স্যুরেন্স ও জরিমানার ঝুঁকি — অবহেলা করবেন না
ভিজিট ভিসা রিনিউয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়ই উপেক্ষিত একটা বিষয় হলো হেলথ ইন্স্যুরেন্স। ইন্স্যুরেন্সের মেয়াদ একবার শেষ হয়ে গেলে কোনোভাবেই ভিসার মেয়াদ বাড়ানো যাবে না — আগে ইন্স্যুরেন্স নতুন করে করিয়ে নিতে হবে, তারপরই রিনিউয়াল সম্ভব। তাই রিনিউ করার আগে সবসময় ইন্স্যুরেন্সের মেয়াদ একবার চেক করে নেওয়া উচিত। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় — ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সৌদি আরবে অবস্থান করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এর ফলে বড় অঙ্কের রিয়াল জরিমানা হতে পারে, এবং ভবিষ্যতে সৌদি আরবে পুনরায় আসার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বা "রেড সিল" জারি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৩-৫ দিন আগেই রিনিউয়াল প্রক্রিয়া শুরু করা সবচেয়ে নিরাপদ। বিঃদ্রঃ এই তথ্যগুলো সাধারণ গাইডলাইন হিসেবে দেওয়া হয়েছে। নিয়মকানুন পরিবর্তনশীল হওয়ায় আবেদনের আগে সর্বশেষ আপডেট MOFA বা আবশার পোর্টাল থেকে যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।